নৃগোষ্ঠী
কালের কণ্ঠ : এমআইটিতে ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন। সেখানে যা শিখেছেন, সেটা নিজের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কিভাবে কাজে লাগাচ্ছেন?
উখেংচিং মারমা : এমআইটিতে ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুবাদে নিজ ভাষাটা আরো ভালোভাবে বোঝার সুযোগ হয়েছে। সেখানে গবেষণা করতে গিয়ে মারমা ভাষার ব্যাকরণের অভাব বুঝতে পেরেছি, যেটা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করা দরকার। ভাষা রক্ষা করা একজনের কাজ নয়, এ জন্য সমাজের সব স্তরের মানুষের এগিয়ে আসা জরুরি। নিজের জায়গা থেকে আমরা ভাষা নিয়ে কাজ করার জন্য সবাইকে উত্সাহিত করি, পলিসি রিফর্মেশনে আমাদের বিভিন্ন ইনপুট থাকে। আমাদের একটা টিম আছে, যেখানে আমরা বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা পলিসি নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। কারণ বাংলাদেশে আমাদের ভাষাগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট পলিসি নেই। গত বছর আমরা ইউনেসকোর ইন্টারন্যাশনাল ডিকেড অব ইনডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ (International Decade of Indigenous Languages)-এর আয়োজনে অংশ নিয়েছি। আশা করি, ভবিষ্যতেও আমরা কাজ অব্যাহত রাখব।
কালের কণ্ঠ : পাহাড়ের শিশুদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভাষা একটা বড় বাধা। কয়েক বছর আগে সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি—এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কতটা কাজে দিচ্ছে?
উখেংচিং মারমা : বিগত সরকারের সময়ে পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণের উদ্যোগ অবশ্যই অনেক প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের বিশিষ্ট ও বুদ্ধিজীবীমহল অনেক দিন ধরেই বলে আসছে, শুধু পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণ করলেই তো হবে না, সেটা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্নমুখী যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বেশির ভাগ শিক্ষকই নিজ ভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তাঁদের অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বছর মাতৃভাষার বইগুলোতে ‘প্রতিবর্ণীকরণ’ যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবর্ণীকরণ বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই আমরা এটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছি। কারণ মারমা ভাষার কথা যদি আমরা ধরি, এটি একটি ‘টোনাল’ ও তিব্বত-বর্মী ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষা। মারমা ভাষার নিজস্ব ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামো, উচ্চারণব্যবস্থা এবং লিখনরীতি রয়েছে, যা বাংলা থেকে আলাদা। বাংলা ভাষার মতোই মারমা লিপিতে বিভিন্ন ধ্বনিচিহ্ন বা স্বরচিহ্ন রয়েছে, যা মূল অক্ষরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উচ্চারণগত, স্বর বা ধ্বনিগত পার্থক্য নির্দেশ করে। ২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যপুস্তকে চাকমা ও মারমা ভাষার বইগুলোতে সংশ্লিষ্ট ভাষার লিপির পাশাপাশি বাংলা লিপির বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে এই দ্বৈত বর্ণমালার পদ্ধতি শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনে এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে চরমভাবে বিঘ্ন ঘটাবে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। এটি করার সময় কমিউনিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। কমিউনিটি কনসেন্ট ছাড়াই এত বড় একটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমাদের শিশুদের নিয়ে সিদ্ধান্তে তো কমিউনিটির মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। কারণ প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে শিশুরা কখনো টোন-অ্যালফাবেট ইন্টার্যাকশন শিখবে না। এমনকি যে শিক্ষকরা নিজ ভাষায় অদক্ষ, তাঁরাও শিশুদের এই প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে ভুলভাবে মাতৃভাষায় পাঠদান করবেন।
কালের কণ্ঠ : পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলেও যোগ্য শিক্ষক কি মিলছে? না হলে সমাধান কী?
উখেংচিং মারমা : শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কমিউনিটি লেভেলে অনেক সংস্থা আছে, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে ভাষার জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার যদি সময় নিয়ে যথাযথভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে অবশ্যই এই প্রণয়নকৃত পাঠ্যপুস্তকের সঠিক ব্যবহার হবে। না হলে আগামী কয়েক দশকেও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতির কোনো উন্নয়ন হবে না।
কালের কণ্ঠ : পাহাড়ে উন্নয়ন নিয়ে নানা কথা হয়। অনেকে বলেন, সবকিছু পর্যটনকেন্দ্রিক। পর্যটন, না শিক্ষা—পাহাড়ে কোনটা বেশি জরুরি?
উখেংচিং মারমা : গত কয়েক দশকে পাহাড়ের উন্নয়নকে নিখুঁত পরিকল্পনা করেই পর্যটনকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা হয়েছে। এবং অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে সেখানে পর্যটন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে আসলে পর্যটন স্পটগুলোর আশপাশে যাদের বসতি, তাদের শিক্ষাসহ অন্যান্য জীবনমান উন্নয়নে অবশ্যই স্থানীয় সরকারকে আরো নজর দিতে হবে। সেখানে যারা বাস করছে, তাদের ইকোট্যুরিজমের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে দেওয়া যায়। আবার পাহাড়ে যেসব পর্যটক ঘুরতে আসছেন, অনেক সময় তাঁরা স্থানীয়দের ধর্ম-সংস্কৃতিকে সম্মান করছেন না। পাশাপাশি তাঁরা আরো বেশি প্লাস্টিকদূষণ করে পরিবেশের ক্ষতি করে চলে যাচ্ছেন।
পাহাড়ের উন্নয়নে অবশ্যই শিক্ষাকে জোর দিতে হবে। পার্বত্যবাসীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য দুর্গম এলাকায় ভালো স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুচিকিত্সার জন্য হাসপাতাল গড়ে তোলাও জরুরি। পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা দরকার, কারণ সেটাই শিশুদের ভিত্তি। পাশাপাশি আমরা এখন হাই স্কুলের পরেও অনেক ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দেখছি, যাদের কর্মসংস্থানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সরকারকে কাজ করা দরকার।
কালের কণ্ঠ : চাকমা, মারমা কিংবা গারোদের তুলনায় খুমি, ম্রো, লুসাই কিংবা খিয়াংয়ের মতো নৃগোষ্ঠীগুলো বেশ পিছিয়ে। তাদের মূল স্রোতে ফেরাতে করণীয় সম্পর্কে বলুন।
উখেংচিং মারমা : এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে চাকমা, মারমাদের চেয়ে বাকি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পিছিয়ে আছে। জনসংখ্যার দিকেও তারা কম। বাকি যে জনগোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে আছে, তাদেরও সাম্যের দৃষ্টিতে দেখতে হবে সবাইকে। বাকিরা পিছিয়ে থেকে একটা জনগোষ্ঠী এগিয়ে গেলেই তো হবে না। আমরা যেমন মং রাজার কার্যালয় থেকে ২০২০ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০০ জনের মতো ছাত্রী ভর্তি করিয়েছি। আমরা সাম্যের দিক থেকে বিচার করে মারমা-চাকমা বাদেও অন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে আনতে অ্যাডভোকেসি করেছি। এখন সেখানে চাক, ম্রো, বম, খিয়াং, সাঁওতাল ছাত্রীরাও পড়াশোনা করছে।
কালের কণ্ঠ : নানা কারণে বিভিন্ন সময় পাহাড় অশান্ত থাকছে। সেখানে কিছু ঘটলেই অনেকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলেন। আসলে এর নেপথ্যে কী আছে বলে মনে করেন?
উখেংচিং মারমা : পাহাড়ের ঘটনাগুলোকে মব সৃষ্ট ঘটনার সঙ্গেই তুলনা করা যায়, যেখানে প্রতিটি ঘটনায় একটা পক্ষই হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের শিকার হয়ে আসছে। আর মব ঘটনার মতোই এই ঘটনাগুলোর কোনো বিচার পাওয়া যায় না; এবং কয়েক দশক ধরে সহিংসতার চক্র চলমান রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল পরিস্থিতি বলতে আমাদের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম বাস্তবতা বুঝতে হবে, যেখানে ভূমি নিয়ে বিরোধ বড় একটা বিষয়। সঙ্গে আরো অনেক কিছু তো জড়িত আছেই। যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়, সেটা আসলে মূল সমস্যাগুলোকে আড়াল করে। যখনই পাহাড়ে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে, ‘বিদেশি হাত’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রান্ত’র কথা বলে মূল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। অনেক সময় অনেক প্রিন্ট এবং অন্যান্য যে মিডিয়া আছে, সেগুলোও সেভাবেই পাহাড়িদের বিরুদ্ধে এই ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে। সহিংসতার ঘটনায় কারা আক্রমণ করল, কেন বিচার পেল না, কাদের স্বার্থে এই সহিংসতা—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মধ্যে হারিয়ে যায়।
কালের কণ্ঠ : একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বম জনগোষ্ঠীর অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি। জামিন পাওয়ার যে নাগরিক অধিকার, তাদের ক্ষেত্রে এটার বাস্তবায়ন নিয়েও অনেকের প্রশ্ন আছে?
উখেংচিং মারমা : বম জনগোষ্ঠীর অনেক নিরীহ ও নির্দোষ ব্যক্তি এখনো ৬৫০ দিনের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে জামিনের প্রক্রিয়াটা খুব ধীরে হচ্ছে। তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের আরো সদয় হওয়ার আহ্বান আমাদের সবার। অনেক স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বম ছেলেমেয়ে বিনা দোষে এখনো কারাগারে রয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবন এখন হুমকির মুখে।
কালের কণ্ঠ : ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে কী ধরনের অঙ্গীকার প্রত্যাশা করেন?
উখেংচিং মারমা : পুরো বাংলাদেশের মতো পাহাড়ও জাতীয় নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায়। প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার আগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আশ্বস্ত করেন যে পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সব সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরে সেটার বাস্তবায়ন খুব কম দেখা যায়।
আবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শুধু ভোটব্যাংকের মতো ব্যবহার না করে তাদের প্রকৃত অধিকার ও দাবি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার আমরা আশা করি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই তাদের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিতে হবে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন তেমন একটা দিয়ে দেখা যায় না। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যেন পাহাড়ি সম্প্রদায়গুলোকে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার না করে, প্রকৃত দাবি ও অধিকার রক্ষায় তাদের পাশে থাকে।